লাপিজ লাজুলি পর্ব – তিন

লাপিজ লাজুলি
সুনেত্রা সাধু
‘ডিজিটাল ডিটক্সিফিকেশন’ বলে একটা কথা আছে। পশ্চিমের দেশে আজকাল খুব চলে, তুমি হয়তো জানবে ন্যান্সী। যে সব মানুষের কাছে সেলফোন আর স্যোশাল মিডিয়ার মোহটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের ওই ডিজিটাল ডিটক্সিফিকেশনের প্রয়োজন। আত্মশুদ্ধি বোঝো? নিজেকে ফিরে পেতে হবে। দেশ দেখতে বেরিয়েছ, দু চোখ ভরে দেখো, ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখবে কেন? নীলের কথায় ‘সরি’ বলে সেলফোনটা একপাশে সরিয়ে রেখে হাসল ন্যান্সি। বলল
আসলে দেবপ্রয়াগে এসে এতটা উচ্ছসিত হয়ে পড়েছি যে সবার সঙ্গে শেয়ার করতে ইচ্ছে করছে।
কথাগুলো বললাম বলে কিছু মনে কোরো না। ছাত্র-ছাত্রী পড়াতে পড়াতে লেকচার দেওয়াটা স্বভাবে দাঁড়িয়েছে।
কি যে বলো নীল, তুমি এখন আমাদের ট্রেনার, এক রকম শিক্ষকই বলা যেতে পারে। তুমি বলতেই পারো। ন্যান্সি অভয় দেয়।
আচ্ছা! তাহলে আমাকেও শিক্ষক হতে হবে দেখছি। লিও নামের ছেলেটি হেসে বলল। ন্যান্সীর সঙ্গে ওর একটা সম্পর্ক আছে বোঝা গেল। পাশে বসা অলিভার নামের ছেলেটি সায় দিল।
গোটা দলটা একসঙ্গে লাঞ্চ করতে বসেছে। সে দলে উৎসাও আছে। সেলফোনের প্রসঙ্গ উঠতেই উৎসার বুকের ধুকপুকুনিটা হঠাৎ বেড়ে গেল। শ্রমণাদি হয়তো অনেকবার ফোন করেছে, বেজে বেজে থেমে গেছে। ফোনটা সঙ্গে নিলেই হত। কী মনে করবে কে জানে! শৌণক ফোন করেনি তো? সেখানে এখন ভোর সাড়ে তিনটে, ফোন করবেই বা কেন? গতকালই কথা হয়েছে। মনে মনে নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। সে খেয়াল না করলেও নীল দেখল উৎসা খাওয়া থামিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। ডাইনিং হলের কাচ ঢাকা জানলার বাইরে তখন আলো মরে এসেছে। মনে হয় আকাশের গায়ে মেঘ জমেছে। দেখে নীল বলল,
পাহাড়ের আবহাওয়াটা অনেকটা মেয়েদের মনের মতো, এই ভাল; এই খারাপ।
উৎসা বুঝতে পেরে হেসে ফেলল। সোফিয়া দলের আর সবার থেকে বয়সে বড়। নীলের কথা শুনে মজার ছলে বলল,
খুব মেয়েদের মন বোঝো দেখছি? আমিও কিন্তু ছেলেদের মন পড়তে পারি, বুঝেছ?
ধরা পড়ে যাবার ভঙ্গীতে দুহাত উপরে তুলল নীল,- ইংরেজী লিটারেচারের অধ্যাপক হয়েও যদি মেয়েদের মন বুঝতে না পারি তাহলে আমার জন্মটাই বৃথা।
এই যে সম্পূর্ন অচেনা এক পরিবেশ, অচেনা মানুষ, টুকরো টুকরো হাসি ঠাট্টা এসবের মধ্যে বসেও উৎসা অতীত ভুলতে পারছে না। মৈনাক বেড়াতে আসত নেশা করবে আর ঘুমোবে বলে। আইটি কোম্পানির কাজের ট্রেস ধীরে ধীরে ওকে যন্ত্র করে তুলছিল। ঠিক কতটা চাপ থাকলে, কতটা অনিয়মিত জীবন যাপন করলে আটত্রিশ বছর বয়সে মানুষ মরে যেতে পারে? দীর্ঘশ্বাস ফেলল উৎসা। এই যে মৈনাক নেই তবু তো সে হাসছে, ঘুরছে, তৃপ্তি করে খাচ্ছে, মনে মনে নীলের সঙ্গ কামনা করছে, এটা পাপ নয়? ভাবতে ভাবতে খাওয়া শেষ করল। নীল বোধহয় মন পড়তে পারে, উদ্দাত গলায় বলে উঠল,
“It’s today: all of yesterday dropped away
Among the fingers of the light and sleeping eyes.
Tomorrow will come on its green footsteps;
No one can stop the river of the dawn.
It’s today, it;s today…….”
উৎসার চোখটা জলে ভরে গিয়েছিল, কোনরকমে সামলে নিয়ে বলল- পাবলো নেরুদা? আমার প্রিয় কবি।
আমারও। তুমি কবিতা পড়ো জেনে খুব ভালো লাগলো। এই যে এত মানুষ, তাদের বিচিত্র মন, তাদের ঘিরে গড়ে ওঠা সমাজ, তার পরিবেশ এই সব কিছু সম্বন্ধে একমাত্র সাহিত্যই একটা সম্যক ধারণা দিতে পারে।
কবিতার প্রসঙ্গে অন্য কবিতার কথাও এল। দলের বাকিরাও কিছু না কিছু বলছে, শুধু উৎসা নীরব। কেউ জানলই না তার একটা নিজস্ব কবিতার খাতা আছে, মৈনাকও কি জানত!
আবার ঘন্টাখানেক পরে দ্বিতীয় দফার ট্রেনিংয়ে বেরোরে ওরা, তার আগে অল্প বিশ্রাম। উৎসা পা চালিয়ে রুমে ফিরে গেল। ফোনটা চেক করা দরকার। শৌনকের কথা বারবার মাথায় আসছে। একটা খুব বাজে অনুভূতি হচ্ছে। খারাপ কোনো ঘটনা ঘটার আগে এমনটা হয় উৎসার। যেদিন মৈনাক বুকে ব্যথা নিয়ে নার্সিং হোমে ভর্তি হল সেদিন সকাল থেকেই এমনটা হচ্ছিল। অকারণেই কান্না পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এটা একটা জীবন? সে সারাদিন যা করে চলেছে তার সবটাই মৈনাকের জন্য, মৈনাককে খুশি করতে; তাহলে তার নিজের বলতে কী রইল? ছেলেপুলে নেই এই গোটা দিন নিয়ে সে কী করবে? যখের মতো সম্পত্তি আগলাবে? একটা চাকরী করত সেটাও ছেড়েছে। সাধারণ চাকরি, স্ট্যাটাসে মেলে না। মৈনাকের উপর উৎসার অভিমানটা বাড়ছিল, ঠিক তখনই অজয়দা ফোনে জানিয়েছিল মৈনাকের নার্সিং হোমে ভর্তি হওয়ার খবর। এরপর বারো-চোদ্দ ঘন্টা কেটেছিল ভয়ানক উদ্বেগ নিয়ে এবং ওই শেষ ইচ্ছেটুকুর কথা বলে বিদায় নিয়েছিল মৈনাক। ও না, আর একটা কথা বলেছিল, “অনেকদিন সমুদ্র দেখিনি……”
ঈশ্বর ঝপাৎ করে একটা একলা জীবন উৎসার কোলে ফেলে দিয়ে বলেছিল, “খুব তো কাঁদছিলি, এই নে। এবার এই জীবন নিয়ে কী করবি কর।” সারাদিন কেঁদেছে বলেই হোক উৎসার চোখে সেদিন আর জল আসেনি। তবে মৈনাকের মৃত্যুতে রেশমি খুব কেঁদেছিল। চোখের জলে ওর সাদা জামার বুকের কাছটা ভিজে উঠেছিল। উৎসা এক মনে দেখছিল। কাঁদলে ভীষণ বাজে দেখায় রেশমিকে, মৈনাক ওকে কখনো কাঁদতে দেখেছিল ? কে জানে… সেই মুহূর্তে ক’ফোঁটা চোখের জলের বড় প্রয়োজন ছিল উৎসার। “বলতে পারেন ,একটু জল পাই কোথা?” অবাক জলপান নাটকের লাইন গুলো পর পর মনে পড়ছিল। আচ্ছা সেকি আদৌ সুস্থ? স্বামীহারা কত মহিলাকে সে আছাড়ি-বিছাড়ি করে কাঁদতে দেখেছে। ওর সারাদিনের অস্বস্তিকর অনুভূতিটা চলে গিয়েছিল। বদলে এসেছিল অনাবিল নির্ল্পিপ্ততা। উপস্থিত লোকজন যেটাকে শোকে পাথর হওয়া ভেবেছিল……
শ্রমণাদির ছটা মিসড কল, শৌনকের একটা। কাকে আগে ফোন করা উচিত ভাবতে ভাবতেই শ্রমণার ফোন এল। কো ইন্সিডেন্স বুঝি একেই বলে। উৎসার সেই বাজে অনুভূতিটা ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল। ছর্রা গুলির মতো অভিযোগ উগড়ে দিচ্ছিল শ্রমণা, ফোটায় ফোটায় রক্ত জমছিল উৎসার মগজে। উৎসা জানে ঠিক এই মুহুর্তে সে যদি নিজেকে সংযত করতে না পারে তাহলে প্রচন্ড রাগে ফেটে পড়বে। সদ্য বিধবা মহিলার রাগে ফেটে পড়া সমীচীন কিনা সে জানে না । মনটা অন্যদিকে ফেরানো দরকার। সে কাচের জানলার সামনে এসে দাঁড়ালো। ইজিচেয়ারে একটা বই হাতে শুয়ে আছে নীল। মুখটা পাহাড়ের দিকে ফেরানো। সে উৎসাকে দেখতে পাচ্ছে না। কী পড়ছে? কবিতা? উৎসা যে কবিতা লেখে সেটা নীলকে বলা যায়? সে তো বাংলা বোঝেই না, তাহলে!
ফোনটা কান থেকে একটু দূরে রেখেছে উৎসা। শ্রমণা থামেনি, একটানা কথা বলে খেয়াল করেছে অপর প্রান্ত নিশ্চুপ। শুনছে কিনা সেটা ঝালিয়ে নিতে “হ্যালো, হ্যালো” বলে উঠল।
বলো, শুনছি।
আমার আর কিছু বলার নেই, রাখছি। বলে ফোনটা কেটে দিল শ্রমণা। উৎসা বসে রইল জানলার সামনে। আচ্ছা, এই যে মানুষ ‘নিজের জীবন’ ‘নিজের জীবন’ বলে লাফালাফি করে, এই নিজের জীবন বলে আদৌ কিছু হয় ? না বোধহয়। আদতে জীবনের সুতোটা থাকে সমাজের হাতে……
খুব ঝাড়লাম , একটা রেসপন্সিবিলিটি নেই! শ্রমণার রাগটা পড়েনি।
ওদের গাড়িটা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সীতাপুর ভিলেজে গিয়ে পৌঁছবে। ওখান থেকে হেলিপ্যাড কাছে। আগামীকাল সকালে ওদের দলটা কেদারনাথের উদ্দ্যেশে রওনা দেবে। আজ রাতটা এই গ্রামেই থাকা। গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছে মসৃণ পিচ রাস্তা ধরে। প্রকৃতি অকৃপণ হাতে সৌন্দর্য বিলিয়ে দিচ্ছে। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বরফে ঢাকা পাহাড়, পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে উত্তাল নদী। ঠিক এই রকম একটা পরিবেশে রাগ আসাটা অস্বাভাবিক, তবু শ্রমণার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে।
বেশ করেছিস বলেছিস, সবারই তো চিন্তা হচ্ছে । মধুরা তাল দেয়।
ও কি বলল? অন্বেষা জিজ্ঞাসা করল।
কিছু বলার মুখ আছে? চুপ করেছিল। শৌনককে ফোন করা হয়েছিল শুনেও কিছু চুপ করে থাকল। আগে ভাবতাম খুব সরল, আসলে মিটমিটে শয়তান। শ্রমণা ক্ষোভ উগরে দিল।
তুই আজ জানলি! আমি বহুদিন ধরেই জানি। এমনি এমনি কাগজের অফিসে কাজ করি না। মানুষ চিনতে পারি। বিজ্ঞের মতো বলল অন্বেষা।
তুমি যাকে শয়তানি বলছ সেটা ভদ্রতাও হতে পারে। ঋদ্ধি স্ত্রীর কথার প্রতিবাদ করল।
ওরে আমার কে রে? যাওয়ার আগে চুমু টুমু খেয়ে এলে নাকি! দরদ একেবারে উথলে পড়ছে। স্বামীকে বিঁধল অন্বেষা।
সে কি রে একা একাই খেলি! আমাদেরও ডাকবি তো! বলেই হা হা করে হেসে উঠল অজয়, বাকীরা যোগ দিল। কে বলেছে শুধুমাত্র টান মেরে কাপড় খুলে নিলেই কাউকে নগ্ন করা যায়? এই মুহুর্তে উৎসার সঙ্গে যেটা হচ্ছে সেটাকে কী বলা হবে? কই দলের আর তিনটে মেয়ে তো রেগে উঠছে না? তারা কেন হাসছে? আসলে তারাও ওই পিতৃতান্ত্রিক সমাজের হাতের পুতুল। প্রতিবাদ মানুষকে একলা করে দেয়, সেই ঝুঁকি কেই বা নিতে চায়? উৎসা সামনে থাকলে এরাই ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকত। আসলে সমালোচিত হতে গেলে দোষের থেকেও সব থেকে বেশি যেটা প্রয়োজন তা হল অনুপস্থিতি।
উৎসা ভাবছিল কলকাতায় ফিরে যাওয়াটাই ভাল। মনটা কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। শৌনকও কি শ্রমণাদির মতো ফোন না পেয়ে বিরক্ত? তাকে ফোন করে নেওয়া উচিত, হয়তো চিন্তা করছে।
তুমি ঠিক আছ তো বৌমণি? উৎসার গলা শুনে প্রথমে এই কথাটা জিজ্ঞেস করল শৌনক।
হ্যাঁ, ফোনটা সঙ্গে নেওয়া উচিত ছিল। ভুল করেছি।
ধুর ছাড়ো তো, বেড়াতে গিয়েছ জমিয়ে ঘোরো। এত কিছু ভাবতে হবে না।
তোমার দাদা নেই তবু আমি আনন্দ খুঁজছি , এটা কি স্বাভাবিক? সবাই তো এমন হয় না শৌনক। তারা কেমন বছরের পর বছর শোক বয়ে বেড়ায়।
যদি উল্টোটা হত তাহলে কী হত বৌমণি? দাদা অফিস যেত না, ক্লাবে যেত না, ট্যুরে যেত না সব ছেড়ে ঘরে বসে থাকত? এই যে দাদা নেই, আমার মন খারাপ করছে না? দেশে গেলে ‘ভাই এসেছিস’ বলে আর কেউ জড়িয়ে ধরবে না। তাই বলে আমি তো শোক নিয়ে বসে নেই বৌমণি। জীবন কি থেমে থাকে?
উৎসার মনটা নির্ভার হয়ে আসছে। বলল,
জানো এখানে একদল বিদেশি এসেছে, আগামীকাল ওরা হোয়াইট ওয়াটার র্যাফটিংয়ে যাবে, আমাকে যেতে বলছে। আমি ঠিক কনফিডেন্স পাচ্ছি না।
আরিব্বাস! দারুণ ব্যাপার, চলে যাও। এ সুযোগ বার বার আসবে না। শোনো, যে কোম্পানির সঙ্গে যাচ্ছ তাদের ডিটেল নিয়ে আমাকে মেল কোরো। ওরা একটা ফোন নম্বর চাইবে, আমারটা দিও। অজয়দা’দের নম্বর দেবার প্রয়োজন নেই। গভীর রাতে আমাকে অকারণে ফোন করে বিরক্ত করল, কোনো সেন্স নেই?
তুমি ঘুমোও শৌনক, পরে কথা হবে। এখন বোধহয় ভোর চারটে, আমিও বিরক্ত করলাম।
এমন বলো না বৌমণি, আমার মন খারাপ হয়। তুমি ভাল থেকো, দেশে আপনার জন বলতে তুমিই আছ…
বাইরে মেঘটা কেটে গেছে। সূর্যটা পশ্চিম দিকের পাহাড় চুড়োটা ছুঁয়ে ফেলেছে। আকাশের নীল রঙটা আবার ফিরে এসেছে। বোধহয় কোথাও বৃষ্টি হয়ে গেল। উৎসা বারান্দায় দাঁড়িয়ে খুব বড় করে একটা শ্বাস নিল, জীবনটা নিজের ছন্দে গুছিয়ে নিতে হবে। বাঁচতে হবে … তৈরী হয়ে ও যখন লনে নেমে এল তখনও বাকিরা রুম থেকে বেরোয়নি। নীল তেমন ভাবেই বই পড়ছিল। উৎসা কে দেখে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। তারপর চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। আজ অনেকগুলো মাস পরে চোখে কাজল দিয়েছে উৎসা। নীল দেখবে বলেই দিয়েছে। তাই লাপিজ লাজুলি রঙের মণিটা যখন ওর দিকে স্থির হয়ে ছিল ও চোখ সরিয়ে নিল না। নিজের জড়তা, কুন্ঠা আর বৈধব্যের অভিমান জলাঞ্জলি দিয়ে তাকিয়ে রইল। নিজে ডুবল, নীলকেও ডুবতে দিল। নৈশব্দের সেতুর দুপ্রান্তে দাঁড়িয়েছিল দুজন, উৎসা অস্ফুটে বলে উঠল, -আমি র্যাফটিং করতে যাব।
হাওয়া দিয়ে ফোলানো নৌকোটা বালির উপরে রাখা ছিল। ওরা ছয় জন উঠে বসল। সবার হাতেই একটি করে প্লাস্টিকের শক্ত দাঁড়। সেটা কেমন ভাবে বাইতে হবে দেখিয়ে দিচ্ছিল নীল। ওরা নকল করছিল। ঢেউ-এর তালে কেমন ভাবে শরীর আগু-পিছু করবে তা শিখছিল। লিও, অলিভার, ন্যান্সী হই হই করছিল, যেন সত্যি সত্যি জলে ভাসছে ওরা। উৎসা আর সোফিয়া প্রাণ খুলে হাসছিল। অনেকদিন পর নির্ভার জীবনটা ফিরে এসেছিল যেন।
তোমরা সারি গান কাকে বলে জানো? জিজ্ঞেস করেছিল উৎসা। অতীত ভুলে খোলা গলায় গেয়ে উঠেছিল- “নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে, ছল ছলাইয়া চলুক রে নাও মাঝ দইরা দিয়া চলুক মাঝ দইরা দিয়া…” নীল ভিডিও করছিল।
দুজনের আর কখনো দেখা হবে কিনা, ওরা জানে না, সময়টা বন্দী রইল ক্যামেরায়। “ছবি দিয়ে ছুঁয়ে থাকা” কথাটা মাথায় এল উৎসার। মৈনাককে মনে পড়ল। ড্রয়িং রুমের দেয়ালে মৈনাকের হাসি মুখের পোট্রেট ঝুলছে, ছবিটা কে তুলে দিয়েছিল? মৈনাককে কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি।
ট্রেনিং শেষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরের উপর বসেছিল ওরা। ‘সারি গান’ আর কেরালার ভাল্লাকালি বোট রেসের ‘ভাঞ্চিপাটু’ গান নিয়ে বেশ অনেকক্ষণ কথা বলল উৎসা। ডাচেদের নৌকো প্রীতির কথা হল, গন্ডোলার প্রসঙ্গ এল আর অসংখ্যবার “লাপিজ লাজুলি মণি”র দিকে তাকিয়ে ফেলল উৎসা, যে চোখে ছিল অপার প্রশ্রয়…
দেবপ্রয়াগ খুব ছোট্ট একটা শহর। দোকানপাটের অধিকাংশই রাম মন্দির সংলগ্ন এলাকায় গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘বাপুকি দুকান’এ চা খাবে বলে ওরা ভিড় ঠেলে চড়াই পথে উঠতে থাকল। বেশির ভাগ দোকানেই পুজোপাঠের সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে, আছে বোতলে ভরা শুদ্ধ গঙ্গাজল। তবে শাল, সোয়েটার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসও দেদার বিকোচ্ছে। প্রায় সব তীর্থ যাত্রীই কিছু না কিছু স্মৃতি চিহ্ন সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। চা খাওয়া হলে দলটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাজার ঘুরতে লাগলো। উৎসার কিছুই প্রয়োজন নেই। সে এবার হোটেলে ফিরবে। নীল কাছেই ছিল, বেশ কুন্ঠা ভরে উৎসাকে জিজ্ঞাসা করল,
তোমাকে একটা জায়গা দেখাতে চাই, যাবে? অবশ্য একলা যেতে তোমার আপত্তি থাকলে জোর করব না। ভয় নেই, তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। আজ দুপুরে সবার সামনে কথাগুলো না বললেই হত, তোমায় অপ্রস্তুতে ফেলেছি, আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
উৎসার নতুন করে কিছু হারানোর নেই। বলল -চলো।
আরও খানিকটা চড়াই পথ ভাঙার পর একটা চাতালে গিয়ে রাস্তাটা শেষ হল। সেখান থেকে সরু নুড়ি পথ চলে গিয়েছে পাহাড়ি বনের ভিতর। ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে তীব্র স্বরে। নীল আগে আগে হাঁটছে, বোঝা যাচ্ছে এ পথ তার চেনা। উৎসার ভয় ভয় করছে, যদিও জঙ্গল তেমন ঘন নয়। মাঝে মাঝে পাইন আর বার্চ গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে আসা চাঁদের আলো বিচিত্র আলপনা তৈরী করছে। কুব কুব শব্দে কোনো একটা পাখি একটানা ডেকে চলেছে। বেশিক্ষণ হাঁটতে হল না। বড় বড় গাছ কমে এলে একটা ঢালু উপত্যকার সামনে এসে পৌঁছলো ওরা। অনেকটা নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অলকানন্দা। পাহাড়ের ঢালে ফুটে আছে নাম না জানা অজস্র ফুল, তাদের গায়ে চাঁদের নরম আলোর প্রলেপ…
আর একটা জিনিস দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল উৎসা। সেই পাহাড়ি উপত্যকায় ভেসে বেড়াচ্ছে অসংখ্য জোনাকি। যেন রাতের তারারা মাটিতে নেমে এসেছে শুধু উৎসাকে ছোঁবে বলে। মুহুর্তের জন্য সে ভুলে গেল তার শোক, দুঃখ, অভিমান আর সদ্য বৈধব্যের অভিশাপ। বেভুল দশা হল তার। এমন দৃশ্য অপেক্ষা করছিল শুধুমাত্র তার জন্য? নীলকে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল। যে কামনার মধ্যে কোন পাপ ছিল না, ছিল একরাশ কৃতজ্ঞতা। তবে চাইলেই সব কিছু পারা যায় না। জড়িয়ে ধরতে গেলে আরো অনেকটা সাহস লাগে, যা উৎসার নেই।
“জোনাকির উপত্যকা তোমাকে দিলাম,” অস্ফুটে বলেছিল নীল। উৎসার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল জল। এমন উপহার তাকে কেউ কখনো দেয়নি। কানায় কানায় ভরে উঠছিল মন। ফেরার পথে ওরা কেউ কোনো কথা বলেনি। তবে নৈশব্দের এক পৃথক ভাষা আছে, দেশ কাল আর সময়ের গন্ডী দিয়ে যাকে বাঁধা যায় না। ওরা দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল ,পায়ের নীচে মড়মড় শব্দে গুঁড়ো হচ্ছিল ঝরা পাতা, নাকি ঝরা সময়?????
(ক্রমশ)
সুনেত্রা সাধু
জোনাকী উপত্যকা দিলাম। – অনেকদিন পর অল্প বয়সে পড়া সুনীল খুঁজে পেলাম। রোম্যান্টিক, রোম্যান্টিক।
প্রকৃতির কাছে মনখারাপ, দুঃখ-বেদনার নিরাময় থাকে।এখানে তো সঙ্গে প্রেমও এসেছে। ভালো লাগছে পড়তে।
খুব ভালো লাগছে পড়তে
খুব ভালো লাগছে পড়তে ।
অনবদ্য চলছে লেখা
‘জোনাকির উপত্যকা তোমাকে দিলাম’
অপরূপ।