চার পর্বের গল্প/মহেঞ্জদারো সু্তা-প্রথম পর্ব/প্রতিভা সরকার

চার পর্বের গল্প/মহেঞ্জদারো সু্তা-প্রথম পর্ব/প্রতিভা সরকার

মহেঞ্জদারো সুতা

(পর্ব ১)

প্রতিভা সরকার

মেয়েটা হঠাতই সাদা একটা গাড়ি থেকে নামল। একটা নীল প্যান্ট আর সাদা টপ পরে আছে। কী দেখতে তাকে!   যেন সাক্ষাৎ মা সরস্বতী রাজহাঁসের ডানার মধ্য থেকে নেমে এলেন। সোনালি রঙ করা লম্বা স্ট্রেইট চুল। বড় সানগ্লাস। বালিঘড়ির মতো সেই ক্ষীণকটি ফিগারের দিকে তাকিয়ে মিউজিয়ামের সামনে অপেক্ষা করা সমস্ত গাইড চঞ্চল হয়ে উঠল। গাইড নেবে মেয়েটা?  নাকি বেশির ভাগ ট্যুরিস্টের মতো একা একা এতোল বেতোল ঘুরে আবার গাড়িতে উঠে পড়বে?

কালো কাচের জানালার বিশাল গাড়িটায় পেছনের সিটে কেউ একজন বসে আছে। আবছা মনে হয় খুব খাড়া নাকের কোনো যুবাপুরুষ।  মোবাইলে চোখ নাকি তার?  গাড়ির কাচ ভেদ করে সেই আলোর ধিকি ধিকি প্রতিফলন। লোকটা নামল না তো! ড্রাইভার তো দিব্যি নেমে উল্টো দিকে কোথায় চলে গেল! ব্যাপারটা কি দেখতে হচ্ছে! রাজেশভাই উত্তেজনায় কয়েক পা এগিয়ে যেতেই মেয়েটার মুখোমুখি হল। মেয়েটা হঠাত সানগ্লাস খুলে বলল, “ইউ মেন্ড্রা! কান্ট ইউ রেকগনাইজ মি? আমাকে চিনতে পারছ না?”

মেয়েটার গলা কাঁপছে। এতো বিপজ্জনক ভাবে এগিয়ে এসেছে সে যে রাজেশ বাধ্য হয় পিছিয়ে যেতে। মেন্ড্রা!  এই নাম সে বাপের জন্মে শোনেনি কখনো। সে বোকার মতো হেসে হাত জোড় করে বলে, নমস্তে ম্যাডাম। নো মেন্ড্রা, আই এম রাজেশভাই কোলি। এই মিউজিয়ামে গাইডের কাজ করি।

 এই মিউজিয়ামটার বয়স খুবই কম, কিন্তু তার বাঁদিকে রোদে গা এলিয়ে পড়ে থাকা সাইটটির বয়স ছয় থেকে চার হাজার বছর। একটা বিরাট কচ্ছপ আর ছোট্ট রঙচঙে প্রজাপতির বয়সের মধ্যে তুলনা করলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। একজন রঙিন পাখনা মেলার সুযোগ পায় চব্বিশ ঘন্টা মাত্র, আর একজন খাওয়া ঘুম মৈথুন নিয়ে কাটিয়ে দেয় পাঁচশ বছর। তেমনি মিউজিয়ামটা পূর্ণ রূপ পেয়েছে ১৯৯৫ সাল নাগাদ, আর তার পাশেই শত শত হেক্টর জুড়ে পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের বয়স ছয় থেকে চার হাজার বছর। যেখানে দাঁড়িয়ে রাজেশ কোলির দিকে বিহবল হয়ে তাকিয়ে আছে দীপিকা পাড়ুকোনের মতো দেখতে মেয়েটা, সেখান থেকেই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে পাথরে তৈরি প্রাকার, নগরের মাঝখানে উঁচু হয়ে থাকা সিটাডেল বা অভিজাত পরিবারগুলির বাসস্থান। দেখা যাচ্ছে ভেঙে পড়া তোরণের অংশ, একটু এগোলেই বিশাল জলাধার। তার পশ্চিম কোণ দিয়ে নীচে নেমে গেছে সিঁড়ির ধাপ, একেবারে জলাধারের শুকনো মেঝে অবদি। ঐ সিঁড়ির ধাপে এখনও রয়েছে জলপাত্র রেখে রেখে ক্ষয়ে যাবার গোল দাগ। রাজেশ কতদিন কতো ট্যুরিস্টের দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষণ করেছে। এই বিশাল ধ্বংসস্তূপের

উত্তর পূর্ব কোণে রয়েছে মিডল টাউন বা অভিজাতদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম সচ্ছলদের বাসস্থান। আর পূব দিকে নদীর ধার ঘেঁষে মূল শহরের বাইরে লোয়ার টাউন বা পাতি আম জনতার বাসস্থান। অধিবাসীদের কেউ পুঁতি কারখানায় কাজ করত, ফুটিয়ে তুলত অলংকারের কারুকার্য, মৃৎপাত্র বানানতে পারদর্শিতা ছিল কারও কারও।

মেয়েটা হঠাত করে হিন্দি ইংরেজি মিশিয়ে বলে উঠল, নো নো, ইউ আর মেন্ড্রা এন্ড আই এম লোকা। আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল এইখানে, বাখিল নগরীতে।

বাখিল? সে আবার কোন নগর ? এই গ্রামটার নাম খাদির বেট, সাইটের নাম ঢোলাভিরা, এই তো জানে সে। যখন বিস্ত সাহেব এখানে খোঁড়াখুড়ি চালাচ্ছিলেন, তখন রাজেশের বাপ জয়মল ভাই ছিল ব্রিক মাস্টার। কী করে ইটের গায়ে ব্রাশ বুলিয়ে ইতিহাস খুঁড়ে তুলতে হয় সেই বিদ্যে শেখাবার এক নম্বর লোক। তা বাপ কেন, তার দাদা পরদাদা কখনও বাখিল সিটির নাম শুনেছে কিনা সন্দেহ। কিন্তু রাজেশ আপত্তি করবার আগেই মেয়েটা খপ করে চেপে ধরল তার হাত। হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেল বিরাট গাড়িটার কাছে। টক টক টোকা মারল কালো কাচের জানালায়। দুম করে নিভে গেল ভেতরের মোবাইল স্ক্রিনের আলো। দরজা খোলার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে যে বেরিয়ে এল, তার দিকে পাক্কা তিন মিনিট হাঁ করে চেয়ে রইল রাজেশ কোলি, তবু তার হাঁ বুজল না।

মানুষ এতো সুন্দর হয় ! পৃথ্বীরাজ কাপুর, শশী কাপুর, রণধীর কাপুর, গোটা কাপুর খানদানকে কেউ হামানদিস্তায় ছেঁচে তৈরি করেছে যেন এই পরম রূপবান পুরুষকে। কী হাইট, কী গায়ের রঙ, কী নাক চোখ মুখ ! রাজেশের মনে হল এইরকম পুরুষের দেখা পাওয়া যায় কেবল হাজার বছরের পুরনো মন্দিরের গায়ে। মেয়েটি এবার খোলা দরজা দিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেবতার মত দেখতে লোকটার হাত চেপে ধরে অনর্গল ইংরেজিতে অনেক কথা বলে গেল, যার অর্ধেকও গুজরাতি মিডিয়ামে বি এ পাশ রাজেশের বোধগম্য হল না। ছাড়া ছাড়া যা বোঝা গেল তাতে মনে হল মেয়েটি বলছে রাজেশকে সে চেনে, আগে দেখেছে। এই জায়গাতেও সে আগে এসেছে। গাড়ির ভেতরে বসা লোকটি তাকে থামাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে বিব্রতভাবে তাকাতে লাগল অচেনা অজানা গাইডের দিকে, আর ক্রমাগত মেয়েটিকে বলতে লাগল,ওকে ওকে বেবি, কুল ডাউন ,কুল ডাউন প্লিজ। শেষের দিকে একটু রেগে গিয়েই যেন বলল, রাকুল, ইউ আর ক্রসিং ইয়োর লিমিট।

 

তাকে নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যাবার ভয়ে রাজেশ দ্রুত সাইটের দিকে পা বাড়াল। আজ সকাল সকাল আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে। রাকুল নামটা কেমন অদ্ভূত, কোন জাতের, কোন ধর্মের মানুষ এরা কে জানে ! কোন শহরে বাস তাও তো জানে না ! এসব ঝামেলায় জড়িয়ে গিয়ে লাভ নেই বাবা। বড়লোকদের ব্যাপার স্যাপার। একে সে কোলি, শিডিউল কাস্ট, এখানে অনেকের কাছেই যেন তা মহা অপরাধ, তারপর তার দিনপ্রতি আয় মেরেকেটে হাজার টাকা। তাও সব দিন নয়। খুব জোরে পা চালাচ্ছিল জয়মল ভাইয়ের একলৌতা বেটা রাজেশ ভাই, কিন্তু পেছনে দৌড়বার আওয়াজ শুনে চোখের কোণে ফিরে দ্যাখে সেই মেয়ে! রোদে তার গালগুলো হয়ে গেছে সিঁদুর বর্ণ, দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাসের তালে উঠছে নামছে টি শার্টের সামনেটা। ধেয়ে আসছে সে তার মেন্ড্রার দিকে। আবার প্রাচীন মন্দিরের কথা মনে পড়ে রাজেশের। তার গায়ে খোদাই নারীমূর্তির মতো সুগঠিত বুক, পেছনে লম্বা চুল উড়ছে, খুলে ফেলেছে চোখ ঢাকা কালো চশমা, দুটো উৎকন্ঠিত চোখের কেন্দ্রবিন্দুতে তাকে ধরে রেখেছে এই মেয়ে, এ কোন মরু-মরিচিকার পাল্লায় পড়ল আজ সে! রাজেশ ভাবে দৌড়ে পালাবে। লুকিয়ে থাকবে গিয়ে ছ’ হাজার বছরের প্রাচীন সমাধিস্থলে।

 

 (২)

শোনা যায় বিবেকানন্দ কোন সাদা চামড়াকে নাকি বলেছিলেন, বাপু হে, তোমার পূর্ব পুরুষ যখন জঙ্গলে জঙ্গলে হুপ-হাপ করে বেড়াচ্ছে, আমাদের পূর্ব পুরুষরা তখন নগর সভ্যতার চূড়ান্ত শিখরে। আধুনিক পয়ঃপ্রণালি, রাস্তা বাজার প্রাসাদ নির্মাণ, সমুদ্রপথে ব্যবসা বাণিজ্য, সমস্তই তাদের আয়ত্তে ছিল।

 এটা তো ঠিক যে পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার স্ফুরণ  হয়েছিল এশিয়ার মাটিতে। মধ্য এশিয়া জুড়ে জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোকচ্ছটা চোখ ধাঁধিয়ে দিত। প্রাচীন চিন ও ভারতীয় উপমহাদেশে কতো গ্রন্থ, কতো আবিষ্কার, কতো অর্জন। কী ভাবে, কোন কারণে সে স্বর্ণযুগ অস্তমিত হল পরিষ্কার জানা যায় না। কিন্তু হরাপ্পা সভ্যতার যে ধ্বংসাবশেষ ভারত পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে তা আর্কিওলজিস্টদের চমকে দেবার মতোই। যদিও তার বেশির ভাগই এখন পাকিস্তানের অন্তর্গত, গুজরাত পাঞ্জাব রাজস্থানেও সেই একই সভ্যতার চিহ্ন বর্তমান।

পাঞ্জাব হরিয়ানা সীমান্তের রাখিগঢ়ি থেকে আবিষ্কার হয়েছে পাঁচ হাজার বছর আগেকার আস্ত নরকংকাল। বাঁ কাতে শোয়ান। মাথার কাছে শস্য ভরা মৃৎপাত্র। সে শস্য কালের আবর্তনে শুকিয়ে পাথরের টুকরো হয়ে গেছে। আর আছে রঙ বেরঙের অজস্র পুঁতি, অলংকার। কোন কিশোরী তার প্রেমিকের জন্য গেঁথেছিল মূল্যবান পাথরের মালা, সেই প্রেমিকের শরীর  কালের আবর্তনে ভঙ্গুর কঙ্কালে পরিণত হয়েছে, কিন্তু গলায় এখনও লগ্ন হয়ে আছে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সেই প্রেমের নিদর্শন। রাজধানী দিল্লির আর্কিওলজিকাল সংগ্রহশালায় সেই প্রাচীন কঙ্কালেরা স্বচ্ছ কাচের বড় কেসে শান্তির ঘুম ঘুমোয়, যতদিন না তাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ধুলো ধুলো হয়ে গুঁড়িয়ে যায় মহাকালের অপ্রতিরোধ্য রথের চাকায়।

দেশভাগের পর হরাপ্পা সভ্যতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়ে গেছে গুজরাত রাজ্যে। একটি লোথাল, যেখান থেকে রমরমিয়ে সমুদ্র বাণিজ্য চলত এমনকি সুদূর মেসোপোটেমিয়ার সঙ্গেও। আর একটি আরও বড় নগর সভ্যতার নিদর্শন। সেটির নাম ঢোলাভিরা। গুজরাতিতে ঢোলা শব্দের অর্থ সাদা আর ভিরা হচ্ছে মরু। সাদা মরুভূমির প্রান্ত ছুঁয়ে আছে বলে জায়গাটির নাম ঢোলাভিরা। রাজেশ কোলি এখানকার গাইড। ভারত সরকারের পুরাতাত্ত্বিক বিভাগ থেকে এই কাজের জন্য তাকে শংসাপত্র দেওয়া হয়েছে। এই খন্ডহরকে সে নিজের প্রাণের থেকেও বেশি ভালবাসে। কোনো ট্যুরিস্ট এখানে এসে উল্টো পালটা বললে সে রেগে যায়, বিশেষ করে প্রাচীন সমাধিস্থলের কাছাকাছি গিয়ে উচ্চকণ্ঠের কথাবার্তা বা হাসির আওয়াজে সে ভয়ংকর খেপে ওঠে।

কিন্তু এই পরমাসুন্দরী মেয়েটির ওপর সে যেন রাগ করতেও পারছিল না। রাকুলের চোখেমুখে, কথা বলার ধরনে কী এক আন্তরিকতা ছিল যে রাজেশের মনে হচ্ছিল, ওর কথা মন দিয়ে শোনা দরকার, প্রাণপণে বোঝার চেষ্টা করা দরকার। তাই রাকুলের পুরুষ সঙ্গীটি আবার গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিলে সে ইচ্ছা অনিচ্ছার দোলায় দুলতে দুলতে রাকুলের সঙ্গে এগিয়ে চলল মূল সাইটের দিকে। জলাধারের কাছাকাছি যখন তারা, রাকুল বলল, “আগে আমি সমাধিস্থলে যেতে চাই মেন্ড্রা। ওখানে একটি খুব দামী জিনিস আমি লুকিয়ে রেখেছি।” রাজেশের ততক্ষণে দৃঢ় ধারণা হয়েছে মেয়েটি একটি বদ্ধ পাগল। তাই দূরত্ব  দু কিলোমিটার এটা জানিয়ে দিয়ে সে রাকুলের আগে আগে গম্ভীর ও চিন্তিত মুখে হাঁটতে লাগল।

 

(ক্রমশ)

প্রতিভা সরকার

 

Nila Banerjee

পুকুরঘাট

একদিন আমরা মাত্র কয়েকজন সদস্য নিয়ে পুকুরঘাট নামের একটি মেয়েদের ভার্চুয়াল দল খুলে ছিলুম। অচিরেই সে কয়েকটি সদস্যের দল কয়েক হাজার সদস্যের মেয়েদের দল হয় ওঠে। পুকুরঘাট দলের মত এত গুণী মেয়েদের সমাহার বাংলাদেশে খুব কম ভার্চুয়াল দলে আছে। কাজেই সেই দল সেখানেই আটকে থাকবে না বলা বাহুল্য। তাই পুকুরঘাট দলের অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে প্রকাশিত হলো পুকুরঘাট পত্রিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 thoughts on “চার পর্বের গল্প/মহেঞ্জদারো সু্তা-প্রথম পর্ব/প্রতিভা সরকার

  1. ইতিহাসের এই সময় টা আমাকে আজ ও মোহিত করে… আপনার লেখায় আগ্রহ বেড়ে গেলো 💐🙏

  2. সত্যি পুকুরঘাট নামটাই কেমন এক আকাশ ভালো লাগা ছড়িয়ে দেয়।অসংখ্য ধন্যবাদ এমন চিন্তার জন্য।

Others Episodes