লাপিজ লাজুলি পর্ব – চার (শেষ)

লাপিজ লাজুলি পর্ব – চার (শেষ)

লাপিজ লাজুলি

সুনেত্রা সাধু

 

পাহাড়ি শহরের চোখে ঘুম নামে বড় তাড়াতাড়ি। দেবপ্রয়াগে রাত্রি আটটার মধ্যে দোকানপাটের ঝাঁপ পড়ে যায়। আগুন ঘিরে আড্ডা বসে ইতিউতি। গাঁজার কলকে ঘোরে হাতে হাতে, অথবা চায়ের ভাঁড়। সাধুসন্তদের আখড়ায় ডৌর আর থকুলী বাজিয়ে নাম গান শুরু হয়। সোরগোলের তোয়াক্কা না করে ভিড়ের মধ্যেই লোমশ কুকুর কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। পাড়াঘরের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে ঘি মাখা গরম রুটির গন্ধ। রাত চিনিয়ে দেয় শহরের চরিত্র। খাওয়া শেষ করে হাঁটতে বেরিয়েছে নীল। “আফটার ডিনার ওয়াক আ মাইল…” তার বহু কালের অভ্যেস। রিসর্ট থেকে বেরিয়ে ঢালু পথ ধরে নামতে গিয়ে একবার ঘুরে দাঁড়লো। দোতলার মাঝের ঘরটায় আলো জ্বলছে, যাকে জানলায় দেখবে ভেবেছিল সে নেই।

 স্কুল জীবনে এমিলি নামের একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম হয়েছিল নীলের। যাকে প্রেম বলতে এখন হাসি পায়। নীল রোজ সন্ধ্যায় এমিলির বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে ঘরে ফিরত। তাকিয়ে থাকত একটা আলো-জ্বলা জানলার দিকে। সেখানে কখনো কখনো দেখতে পেত কাঙ্খিত রমণীকে। যদিও সেই প্রেম ছিল ক্ষণস্থায়ী। মোহ ভাঙলে সেই ঘটনাকে নিতান্ত ছেলেমানুষী মনে হয়েছিল। অথচ আজ এতগুলো বছর পরেও একটা আলো-জ্বলা জানলা ওকে টানছে। ছেলেমানুষীর বোধহয় কোনো বয়স হয় না, আমরা বড় হবার ভাণ করি মাত্র। আজ আর নীলের  একা হাঁটতে ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে উৎসা থাকলে বেশ হত। রাতের বনপথ, সেই চাহনি আর মিষ্টি একটা গন্ধ ওর সঙ্গ ছাড়ছে না। সিঁড়ি দিয়ে আনমনে নামছিল, ঘাটটা একেবারেই ফাঁকা। বেশ ঠান্ডা হাওয়া বইছে, আকাশটা মেঘহীন। জলে পা ডুবিয়ে বসে তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল নীল। কলকল শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে আসছে না। আচ্ছা,মেয়েটা কখনো রাতের দিকে  সঙ্গম ঘাটে এসেছে ? দেখেছে অলকানন্দার জলে কেমন করে খেলা করে চাঁদ? বা ভাগীরথীর স্রোতের মাথায় আলোর ভেঙে যাওয়া? নীলের খুব ইচ্ছে করছে উৎসার সঙ্গে কথা বলতে, একটা কল করা যায় না? আজ ডিনারের আগে র‍্যাফটিং ট্যুরের কাগজ পত্রে সই করাতে গিয়ে ফোন নম্বর দেয়া নেয়া হয়েছে। এত রাতে ফোন করলে খারাপ ভাববে? ভাবুক, নম্বর ডায়াল করল নীল। দুবার বাজতেই হ্যালো বলল উৎসা, যেন এই ফোনটার অপেক্ষাতেই ছিল সে।

বিরক্ত করলাম?

না তো……।

নীল অনেক কথা বলবে ভেবেছিল। নদী, জোৎস্না, সঙ্গম ,তারা……    

তার বদলে জিজ্ঞেস করল,

 প্যাকিং শেষ? আমরা কিন্তু ব্রেকফাস্ট সেরেই রওনা দেব। সকালে হরিদ্বার থেকে গাড়ি আসবে। রাফটিংয়ের  জিনিস পত্র, টেন্ট, খাবার দাবার নিয়ে। আর হ্যাঁ তোমার ইজি টু ড্রাই পোষাক আনতে বলেছি, সেরকম কিছু তো ছিল না তোমার…

থ্যাঙ্কিউ, আসলে পরিকল্পনা ছিল না। এখনো দোলাচলে ভুগছি। গিয়ে তোমাদের অসুবিধায় ফেলব না তো? 

আমি তো আছি, বলেই নিজেকে শুধরে নিল নীল। মানে আমরা সবাই আছি, অসুবিধা কী?

উৎসা প্রাণপন চাইছিল নীল অন্য কথা বলুক। সেই জোনাক-জ্বলা উপত্যকার প্রসঙ্গ  আসুক। আর একবার বলুক   It’s today, it’s today……..  অথচ ছেলেটা সে সবের ধার দিয়েই যাচ্ছে না। হাসি পাচ্ছে উৎসার, সে অনুভব করছে নীল এই কথাগুলো বলার জন্য তাকে ফোন করেনি। ওকে থামিয়ে দিয়ে উৎসা জিজ্ঞেস করল,

 তোমার কথা তো শোনা হয়নি, তোমার স্ত্রী, ছেলে মেয়ে?

আমার কেউ নেই উৎসা। সমস্ত আপন জন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।

স্ত্রী ? কী করে? 

না না তার কিছু হয়নি। বা হয়ে থাকলেও জানি না, সে আমাকে ত্যাগ করেছে।

‘কেন?’ এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে উৎসার ভদ্রতায় বাঁধল। এমন একটা প্রসঙ্গ না তুললেই হত। ‘সরি’ বলল।

সরি বলার তো কিছু নেই উৎসা। আমাদের দু’জনে্রই স্বাধীন মতামত ছিল। উচ্চাকাঙ্খাবিহিন সাধারণ জীবন ওর পছন্দ ছিল না। অথচ এই সাধারণ জীবনটাই আমার কাছে বড্ড দামী। কান্ট্রি সাইডে একটা  পুরনো পৈত্রিক বাড়ি, হাঁটা পথে ইউনিভার্সিটি, চেনা প্রতিবেশী… এইরকম একটা নিস্তরঙ্গ, নিশ্চিন্ত জীবনের ঘেরাটোপ থেকে বেরোতেই পারলাম না। বিয়েটা টিঁকল না। তার জন্য দুজনেরই তেমন দুঃখ নেই। আমরা নিজের জীবন, নিজের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছি। জানো তো উৎসা, আজকের দিনে জীবনটাকে সাধারণ ভাবে লালন করাটাই কিন্তু সব থেকে বেশী কঠিন।

উৎসা ফোনের এপারে মৃদু হাসে। একথা তার থেকে বেশি কেই বা জানে! মামার বাড়ির এজমালি সংসারে বড় হওয়া , সাধারণ অফিসে চাকরি করা একটা মেয়ে যখন বিয়ের পর তিরিশ লাখের গাড়ি চড়ে মামার বাড়ির দরজায় এসে নামত, আর তার খাতির যত্ন করার জন্য মামীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত, আলমারি থেকে দামী কাচের ডিশ বার করা হত, মামাতো ভায়েরা নামী দোকান থেকে মিষ্টি আর ফিশফ্রাই আনতো তখন কি উৎসা বোঝেনি তার জীবনটা আর সাধারণ নেই? অথচ বিয়ের আগে এক টুকরো ফিশফ্রাই চেয়েছিল বলে ভাই সিঁড়ি থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল। বাঁদিকের কপালে কাটা দাগটা এখনো আছে। বিয়ের পর সেই ভাইকে ব্যবসা করার জন্য দু লাখ টাকা দিয়েছিল উৎসা। তার জীবনটা সাধারণ নয় বলেই তো পেরেছিল। সে জানে বড় বড় খুশিরা ঠিক কীভাবে ছোট ছোট খুশিদের গিলে খায়। ভাবনায় বাঁধ দিয়ে উৎসা বলল, 

 – রাত বাড়ছে তুমি ফিরে এসো নীল। ঠান্ডা লেগে যাবে।  

– মা মারা যাবার পর এমন করে কেউ বলেনি। বাধ্য ছেলের মতো উঠে পড়ল নীল। কথা থামল না। বাকি পথে নীল আর উৎসার ওয়েভ লেন্থের মধ্যে, উড়তে থাকল অসংখ্য  জোনাকি। 

 

সীতাপুরে বড় হোটেল নেই। একটা হোমস্টের ডর্মিটারিতে ওরা ছ’জন এক সঙ্গে আছে। পর পর ছটা খাট সার দিয়ে সাজানো। আপাতত দুটো খাটে ভাগাভাগি করে ওরা বসেছে। বোতল খোলা হয়েছে, ব্যাগ থেকে চিপস চানাচুর বেরিয়েছে। সেই থেকেই গজ গজ করছে শ্রমণা। বিরক্ত হয়ে বলল, 

তীর্থ করতে এসেও তোমাদের বোতল খোলা চায়!

যাহ বাবা তীর্থের সঙ্গে বোতলের কী সম্পর্ক ? আমরা তো আর পূণ্যলাভের আশায় আসিনি। একটা কর্তব্য ছিল পালন করেছি। মেয়েটা এদ্দুর একা একা আসত…… গ্লাসে বাদামী তরল ঢালতে ঢালতে বলল অজয়।

হ্যাঁ তোমার তো দয়ার শরীর। এতকাল ধরে বলেছি চলো কেদার-বদ্রী ঘুরে আসি, এসেছ? যেই দেখলে উৎসাকে নিয়ে আসতে হবে, ওমনি পেছন পেছন দৌড়লে… শ্রমণা মুখ বেঁকিয়ে অভিযোগ করল। বাকিরা ঝগড়াটা উপভোগ করছিল।

তোমার কথাতেই তো কেদার এলাম, নইলে দেবপ্রয়াগ থেকেই কলকাতা  ফিরে যেতাম। তোমরা মেয়েরা এত কুটিল জটিল হও কেন বলোতো? নিজের কলজে উপড়ে তোমাদের পায়ের কাছে রেখে দিলেও মন পাওয়া যায় না। অজয় বেশ বিরক্ত হয়েই বলল।

তোমাদের তোমাদের করবেন না অজয়দা, সব মেয়ে সমান হয় না।  আমার কেদার আসতে ইচ্ছে করলে আমি একাই আসতাম, ঋদ্ধির পায়ে তেল দেব নাকি! বেশ গর্বের সঙ্গে বলল অন্বেষা।

আমি বাবা নিজের বরের সঙ্গে বেড়াতে যেতে ভালোবাসি। শুভঙ্কর আমাকে অনেক ঘুরিয়েছে, বলে বরের গায়ে ঢলে পড়ল মধুরা। অজয় আর ঋদ্ধি খুক খুক করে হেসে উঠল।

এতে হাসির কী আছে? শুভঙ্কর মধুরাকে অমনি কথায় কথায় অপমান করে না। মৈনাকও কখনো করত না। শ্রমণার কথা শুনে অজয়, ঋদ্ধি আর শুভঙ্কর তিনজনেই হেসে উঠল। অজয় বলল।

 এরা রেশমীর কেসটা জানে না?

মেয়েদের কৌতুহল অপার… তিনজনেই একযোগে জিজ্ঞাসা করল “কে রেশমী?”

মৈনাকের ইয়ে…একসঙ্গে শপিংয়ে যাচ্ছে। ট্যুরে যাচ্ছে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রজেক্ট হ্যান্ডেল করছে, অথচ আমাদের টিম যেন শুকনো মরুভূমি। সব মুষকো মুষকো জোয়ান ব্যাটাছেলে… 

হাটের মাঝে আবার কোন হাড়ি ভেঙে ফেলবে কে জানে! ভয় পেয়ে ঋদ্ধি বলল,

 তোমার নেশা হয়ে গেছে অজয়দা।

চুপ কর তো! নেশা হয়ে গেছে…এখনো তিন নম্বর পেগ শেষ হল না, নেশা হয়ে গেল! যে কোনো মাতালকে নেশা হয়ে গেছে বললেই খিঁচিয়ে ওঠে ,অজয়ও উঠল। অফিসের কেচ্ছা কাহিনির ভান্ডার খুলে বসত হয়তো, কিন্তু তিনজন মহিলা রেশমিকে শনাক্তকরণে মন দিল। 

ওই মেয়েটা রেশমী না? ওই যে শ্রাদ্ধের দিন সাদা হাকোবার আনারকলি পরে উৎসার হাত ধরে বসেছিল? চিনতে পেরেছি। অফিস পিকনিকে এক ঝলক দেখেছিলাম বটে…কিন্তু ওটা রেশমি হলে উৎসার সঙ্গে এত ভাল সম্পর্ক থাকত? কেমন হাত ধরে গল্প করছিল দেখলি?  আমি হলে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতাম। শ্রমণা রাগের সঙ্গে কিছুটা অবিশ্বাস মিশিয়ে বলল।

হাকোবা আবার কী? হুঁকো জাতীয় কিছু? নেশা হয়? অজয় হাঁ করে জিজ্ঞেস করল।

মরণ, খালি নেশার ধান্ধা। হাকোবা এক রকম ড্রেস মেটিরিয়াল।

ওহ তাই বলো। তবে তুমি ভয় পেও না শ্রমণা, আমার কোনো রেশমি নেই।  থাকলেও তুমি যা পারবে উৎসা কি আর তাই পারে? ঝাঁটা কি আর সবার হাতে মানায়? মৈনাক তো মরেই গিয়েছে ফালতু এই কেচ্ছা নিয়ে বাড়ি মাথায় করা কি ঠিক? তাই উৎসা রেশমীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি। আসলে ভদ্রতা আর শালীনতাবোধটা ও জলাঞ্জলি দিতে পারেনি, হয়তো পারবেও না। 

সমস্ত আলোচনার শেষে কোনো না কোনো ভাবে উৎসা মুখার্জি জিতেই যায়। সেই জয় নস্যাৎ করতে শ্রমণা হিসিহিস করে বলে উঠল।

 শালীনতা! দেখো গে ঐ বিদেশি ছেলেটার সঙ্গে ঘরে দোর দিয়েছে।

 আড্ডাটা ওখানেই ভাঙল। রাত বাড়ছে। আগামীকাল সকাল সকাল ওদের রওনা দিতে হবে। ‘দোর দেওয়া’র কথা শুনে ঋদ্ধির বুকে চিনিচিনে একটা ব্যথা হল। মধুরা ঘড়িতে অ্যালার্ম দিল। অন্বেষা গোড়ালিতে বোরোলীন ঘষতে থাকল, আর শ্রমণা চোখের জল মুছে ব্ল্যাঙ্কেটটা মাথা অবধি টেনে নিল। ওই উৎসার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্কই সে রাখবে না। জানলার শার্সি গুলো তখন কাঁপছিল। হাওয়া, নাকি অভিযোগের কু বাতাস বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল কে জানে?

 

গাড়ির মাথায় লাগেজ বাঁধা হচ্ছে। কেবল উৎসারই ঢাউস একটা সুটকেশ, বাকীদের ব্যাক-প্যাক।                          

এতে কী এক বছরের জামা কাপড় আছে? কোথায় কোথায় যাবার প্ল্যান আছে শুনি? প্লাস্টিক দিয়ে লাগেজ গুলো ঢাকতে ঢাকতে জিজ্ঞেস করল নীল।

ভাবছি চাঁদে যাব। বেশ সিরিয়াস ভঙ্গীতে উৎসা উত্তর দিল।

সুটকেস বইতে লোক লাগলে বোলো। আছি। 

নীলের কথা শুনে হেসে ফেলল উৎসা। ওদের বন্ধুত্বের বয়স চব্বিশ ঘন্টা। নীল এতটা সহজ আর স্বচ্ছন্দ বলেই কি উৎসা মন খুলে নিজের কথা বলতে পারছে? নাকি মনের ভিতর একটা ফাঁকা জায়গা ছিল বলেই এত তাড়াতাড়ি বন্ধুত্ব হল? হিসেব মিলিয়ে কীই বা হবে… ভাবনাটা মুলতুবি থাকল কারণ ঘাটের দিকে রওনা দিতে হবে।

 ঝকঝকে রোদ উঠেছে। ভাগীরথীর ঢেউ এর মাথায় মোচার খোলার মতো দুলছে বেঁধে রাখা ডিঙি। উৎসার ভয় করছে। যদি সে জলে ভেসে যায়! যদিও লাইফ জ্যাকেট আছে, তবু…                                                        দলের বাকি মেয়েরা বেশ সাহসী। উৎসা বসল নীলের ঠিক পিছনে। আজ নীল ছাড়া আরো একজন ট্রেনার আছেন। যাত্রা শুরু হল। স্রোতস্বিনী গঙ্গার  ধারা কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল। ওরা ভিজছে , সমস্ত প্রাণ শক্তি দিয়ে চিৎকার করছে, হই হই করছে। উৎসা কখনো ভাবেনি এমন একটা অ্যাডভেঞ্চারাস দিন তার জীবনে আসবে। চিৎকারের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ওর সমস্ত শোক, দুঃখ, গঞ্জনা, অভিমান। সব্বাইকে ক্ষমা করে দিতে ইচ্ছে করছে … 

অর্ধেক নদীপথ পেরিয়ে ওরা যখন কোদিয়ালা পৌঁছলো তখনো দুপুর হয়নি। গাড়ি থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে টেন্ট, রান্নার সামগ্রী। হাতে হাত লাগিয়ে টেন্ট খাটালো উৎসা। ও আর সোফিয়া একসঙ্গে থাকবে। বেশ একটা পিকনিক পিকনিক আমেজ। দুপুরে সুপ, নুডুলস আর ফল খাওয়া হল। সোফিয়া চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে পাখি খুঁজতে বেরোল। লিও, অলিভার আর ন্যান্সী জাল খাটাচ্ছে, বিচ ভলি খেলবে। উৎসা এসবে নেই। একাই হাঁটা দিল জঙ্গলের দিকে। দুপাশে পাইন গাছের সারি, মাঝখান দিয়ে সরু হাঁটা পথ। তির তির করে বাতাস বইছে, গায়ে মাখছে উৎসা। নির্জন জঙ্গলে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনিতে অদ্ভুত এক মৌনমুখরতার সৃষ্টি হচ্ছে। ও শুনছে কান পেতে, হাঁটছে আনমনে। একটু এগোতেই চড়াই শুরু হল। পাথর ভেঙে ভেঙে বেশ খানিকটা উপরে উঠে এসে থামল উৎসা। নদীটা এখন অনেকটা নীচে। হাঁফাচ্ছিল, জঙ্গলের ভিতর একটা পাথরে বসল। ভাবতে থাকলো আজ এইখানে তার আসা লেখা ছিল বলেই কি মৈনাক মরে গেল? নাকি ও মারা গেল বলে এখানে আসা হল? সবটাই তবে পূর্ব নির্ধারিত? ঠিক এই পরের মুহুর্তে কী হবে উৎসা জানে না, কিন্তু সেটাও লেখা আছে হয়তো। কোথাও একটা খচমচ শব্দ হচ্ছে। ঠিক সেই মুহুর্তে ওর মনে হল জঙ্গলে কী বাঘ থাকতে পারে? ইশ, এত দূর একলা আসা ঠিক হয়নি। শব্দটা কাছে আসছে। গলাটা শুকিয়ে আসছে উৎসার। ঠিক কোন জায়গাটা দিয়ে উপরে এসেছিল মনে করতে পারছে না। পায়ে চলা পথটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। দু একবার এদিক ওদিক খুঁজেও পথের হদিশ পাওয়া গেল না। সব গুলিয়ে যাচ্ছে। চোখ দিয়ে জল ঝরছে, মৃত্যু ভয় হচ্ছে উৎসার। ফোনে টাওয়ার নেই। দিশেহারা লাগছে। তাঁবুগুলো দেখা যাচ্ছে না। নদী লক্ষ্য করে যেমন করে হোক নামতে হবে। কিন্তু সে যদি পৌঁছতে না পারে? ওকে জঙ্গলে ফেলে সবাই যদি চলে যায়! একটু পরেই আঁধার নামবে।  অকারণ ভয়টা উৎসার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ছিল। আর ঠিক সেই মুহুর্তে চোখের সামনে দেবদূতের মতো এসে দাঁড়ালো নীল। উফফ, বেঁচে যেতে এতটা ভালো লাগে? 

যেটা আজ করেছ আর কখনো কোরো না। তোমার ধারনা আছে একটা বিপদ হলে কোম্পানীর কতটা বদনাম হয়? জঙ্গলে চিতা, বন্য শূকর থাকে তুমি জানো না ? বেশ রেগে গিয়ে বলল নীল।

এই নীলকে উৎসা চেনে না। কাঁদতে কাঁদতে পিছু নিল। পাহাড়ে চড়া যতটা কঠিন নামা তার থেকে অনেক বেশি কঠিন। “আমি নামতে পারছিনা, ভয় করছে।” শুনে ঘুরে দাঁড়াল নীল, লাপিজ লাজুলি মণিতে তখন কাঠিন্য।

উঠতে যখন পেরেছ ঠিক নামতে পারবে। চেষ্টা করো।

শুনে আবার কান্না পেল, গাছের ডাল ধরে পাথরের খাঁজে পা দিয়ে কোনো রকমে নেমে এল উৎসা। এত রাগের কী আছে! সত্যি সত্যি তো আর বাঘ আসেনি, আর আমি মরে গেলেই বা কার কী আসে যায়?  নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে রাস্তা শেষ করল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। চাঁদের আলোয় চকচক করে উঠল বেলাভূমির রূপোলী বালি। ক্যাম্প ফায়ার হবে। আগুন ঘিরে সাজানো হল ভাঁজ করা চেয়ার। নীলের হাতে  গিটার , এটা কোথা থেকে এল? উৎসার মনে প্রশ্ন। গাড়িতে ছিল হয়তো, নিজেই মনে মনে উত্তর দিল। বব ডিলানের গান গাইছে নীল, শৌনক খুব শুনত, উৎসার কানে আসত।   

 “Sad-eyed lady of the lowlands

Where the sad-eyed prophet says that no man comes

My warehouse eyes, my Arabian drums

Should I leave them by your gate

Or, sad-eyed lady, should I wait?”

কান্না লুকোতে শেখেনি উৎসা, আগুনের শিখা ঝাপসা হয়ে আসছিল। এটা পূর্বজন্ম নাকি পর জন্ম দ্বন্ধ জাগছিল,  নিজের টেন্টে এসে চোখ বুজে শুয়েছিল উৎসা। মৃত মানুষকে হারিয়ে ফেলা আর জীবিত মানুষকে হারিয়ে ফেলার মধ্যে অনেক  ফারাক। নীলকে ছেড়ে ফিরতেই হবে, শোকটা ওকে জড়িয়ে ধরছিল। ভেজা চোখে ঘুম এল। কখন গান ভেঙেছিল, আড্ডা থেমেছিল উৎসা জানেনা। 

ঘুমটা পাতলা হয়ে এলে দেখল তাঁবুর বাইরে নিচু স্বরে কেউ ডাকছে। আধঘুমে সেই ডাক স্বপ্নের অংশ বলে মনে হচ্ছে। ঘোর কাটলে উঠে বসল উৎসা। ভোর চারটে বাজে। পাশেই সোফিয়া বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। বাইরে থেকে আসা গলাটা নীলের। ব্যস্ত হয়ে গায়ে গরম জামা জড়িয়ে টেন্ট থেকে বেরিয়ে এল উৎসা। নীল দাঁড়িয়ে আছে সামনে। আর নীলের মাথার উপর ঝলমল করছে অসংখ্য তারা। যেন আর একটু হলেই ছুঁয়ে ফেলবে পৃথিবী। পরম বিষ্ময়ে আকাশ পানে তাকিয়ে রইল উৎসা। 

এই তারাভরা আকাশটাও তোমাকে দিলাম। ফিসফিস করে বলে উঠল নীল।

অপূর্ব। 

আর একটু পরেই ভোর হবে, পাহাড় দেশে ভোর বড় সুন্দর। এই সময়কে সাক্ষী রেখে তোমাকে একটা কথা বলতে পারি উৎসা?

বলো…

আমার ব্যবহারের জন্য আমি দুঃখিত। তোমাকে খুঁজে না পেয়ে খুব ভয় পেয়েছিলাম।

আমিও। আর পাহাড় থেকে নামতে সত্যিই কষ্ট হচ্ছিল। যদিও সাহায্য চাওয়া ঠিক হয়নি।

আমি লজ্জিত উৎসা। আমার সাহায্য করা উচিত ছিল। তবে এই বেলাভূমিও কম দূর্গম নয়! সাহায্য চাইবে না?  হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিল নীল। তারপর শক্ত মুঠিতে ধরে রেখেছিল উৎসার হাত। তির তিরে সুখ বইছিল উৎসার মনে। আকাশের গায়ে তখন গোলাপি ছোপ লেগেছিল। ঘুম ভাঙছিল পাখিদের। উৎসার মাথায় জেগে উঠছিল ঘুমিয়ে থাকা প্রিয় কবিতারা…

      “হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়

        সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়

       এ কথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে

        সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয় ।”

উৎসা শুধু অস্ফুটে বলে উঠেছিল “লাপিজ লাজু্লি………….”

(সমাপ্ত)

সুনেত্রা সাধু

Nila Banerjee

পুকুরঘাট

একদিন আমরা মাত্র কয়েকজন সদস্য নিয়ে পুকুরঘাট নামের একটি মেয়েদের ভার্চুয়াল দল খুলে ছিলুম। অচিরেই সে কয়েকটি সদস্যের দল কয়েক হাজার সদস্যের মেয়েদের দল হয় ওঠে। পুকুরঘাট দলের মত এত গুণী মেয়েদের সমাহার বাংলাদেশে খুব কম ভার্চুয়াল দলে আছে। কাজেই সেই দল সেখানেই আটকে থাকবে না বলা বাহুল্য। তাই পুকুরঘাট দলের অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে প্রকাশিত হলো পুকুরঘাট পত্রিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 thoughts on “লাপিজ লাজুলি পর্ব – চার (শেষ)

Others Episodes